পশ্চিমবঙ্গের দুই বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনেই জয় পেল বিজেপি। শুক্রবার, ৯ অক্টোবর প্রকাশিত ফলাফলে নন্দীগ্রামে রেকর্ড ব্যবধানে জিতেছেন দলের প্রার্থী হাসিরানি রথ। অন্যদিকে, মুসলিমপ্রধান রেজিনগরে বিজেপির জয় রাজ্য রাজনীতিতে চমক তৈরি করেছে। তৃণমূলের পনেরো বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসার প্রায় পাঁচ মাস পরে এই সাফল্য শাসক দলের অবস্থান আরও মজবুত করল।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত ফল অনুযায়ী, নন্দীগ্রামে হাসিরানি পেয়েছেন ১ লক্ষ ৬৪ হাজার ৪২৭ ভোট। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসের মিলন প্রধানের প্রাপ্ত ভোট ৪১ হাজার ৬৭৪। জয়ের ব্যবধান ১ লক্ষ ২২ হাজার ৭৫৩। সিপিআই প্রার্থী শান্তিগোপাল গিরি ৫ হাজার ৭৭৯ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছেন। ভোটের ব্যবধানে অন্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের অনেক পিছনে ফেলে দিয়েছেন বিজেপি প্রার্থী।
হাসিরানি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নিহত ব্যক্তিগত সহকারী চন্দ্রনাথ রথের মা। গত ৬ মে মধ্যমগ্রামে চন্দ্রনাথ খুন হন। ফলে তাঁর মায়ের প্রার্থিতার সঙ্গে রাজনৈতিক লড়াইয়ের পাশাপাশি ব্যক্তিগত শোকের আবেগও জড়িয়ে ছিল। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে শুভেন্দু নন্দীগ্রামে ৯ হাজার ৬৬৫ ভোটে জিতেছিলেন। পরে ভবানীপুর আসনটি রেখে নন্দীগ্রাম ছাড়ায় এখানে উপনির্বাচন হয়।
নন্দীগ্রামে বিরোধীদের সমীকরণও শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয়নি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন তৃণমূলের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে শুভেন্দুর সঙ্গে দেখা করার পরে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ান। এরপর বিজেপিবিরোধী ভোটের বিভাজন ঠেকাতে মমতা কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থন করেন। কিন্তু সেই সমর্থন সত্ত্বেও কংগ্রেস বিজেপিকে উল্লেখযোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে ফেলতে পারেনি।
মুর্শিদাবাদের রেজিনগরে বিজেপির শাখারভ সরকার পেয়েছেন ১ লক্ষ ২৯ হাজার ৯১৪ ভোট। আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রার্থী গোলাম নবী আজাদের প্রাপ্ত ভোট ৫৪ হাজার ৯৮। বিজেপি জিতেছে ৭৫ হাজার ৮১৬ ভোটের ব্যবধানে। মোট ভোটের প্রায় ৬৩.১৪ শতাংশ গিয়েছে বিজেপির ঝুলিতে। প্রায় সত্তর শতাংশ মুসলিম ভোটার অধ্যুষিত এই কেন্দ্রে এমন ফল বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
গত বিধানসভা নির্বাচনে রেজিনগরে ৫৮ হাজারের বেশি ভোটে জিতেছিলেন আম জনতা উন্নয়ন পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুমায়ুন কবীর। তিনি নওদাতেও জয়ী হন। নওদা রেখে রেজিনগর ছেড়ে দেওয়ায় উপনির্বাচন প্রয়োজন হয়। বাবার ছেড়ে দেওয়া আসনে এবার প্রার্থী হয়েছিলেন ছেলে গোলাম নবী আজাদ। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই এই কেন্দ্রে সম্পূর্ণ উল্টো ফল হল।
ফলাফলকে সংখ্যালঘু ভোটারদের মনোভাব বদলের প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেছেন শুভেন্দু। তাঁর দাবি, মুসলিম ভোটারদের সমর্থন পাওয়ার কারণেই রেজিনগরে বিজেপির জয় সম্ভব হয়েছে। সংখ্যালঘুরা বিজেপিকে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং আগের সরকার তাঁদের বিভ্রান্ত করেছিল বলেও দাবি করেন মুখ্যমন্ত্রী। তবে সামগ্রিক ফলাফল থেকে কোন সম্প্রদায়ের কত মানুষ কাকে ভোট দিয়েছেন, তা নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা যায় না।
প্রচারে রেজিনগরের উন্নয়নকে সামনে রেখেছিল বিজেপি। শুভেন্দু সেখানে সেতু, কলেজ, হাসপাতাল ও শিল্পসংক্রান্ত প্রকল্পের প্রতিশ্রুতি দেন। সংখ্যালঘু ভোটারদের কাছে সরাসরি সমর্থনও চান। বিজেপি নেতাদের বক্তব্য, স্থানীয় মানুষের উন্নয়নের প্রত্যাশাই এই জয়ের অন্যতম কারণ। বিরোধীদের বিভক্ত অবস্থাও নির্বাচনী লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে উঠে এসেছে।
অন্যদিকে, বিরোধীরা ভয় দেখানো, পুলিশি চাপ এবং ভোটে কারচুপির অভিযোগ তুলেছে। মিলন প্রধানের অভিযোগ, ভোট লুটের কারণেই এই ফল হয়েছে। রেজিনগরেও কংগ্রেস প্রশাসনকে ব্যবহারের অভিযোগ করেছে। হুমায়ুন কবীর দাবি করেছেন, তাঁর দলের কর্মীদের গ্রেপ্তার ও মামলা দিয়ে চাপে রাখা হয়েছিল। বিজেপি অবশ্য জয়কে জনসমর্থনের স্বীকৃতি হিসেবেই দেখছে। ফলে দুই আসনের ফল শাসক দলের শক্তি বাড়ানোর পাশাপাশি নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক বিরোধও বহাল রাখল।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জয়ী প্রার্থী ও দলীয় কর্মীদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, এই ফলাফল বিজেপি ও এনডিএর সুশাসনের কর্মসূচির সঙ্গে মানুষের সংযোগের প্রতিফলন। জনকল্যাণ ও মানুষের প্রত্যাশা পূরণের কাজে এই জনাদেশ বাড়তি শক্তি দেবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
Show quoted text